ড. সুমনপ্রিয় মহাস্থবিরের রাজকীয় মহাস্থবির বরণ ও জীবনগাথা: মানবতার সেবায় উৎসর্গীকৃত এক আলোকবর্তিকা
বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার নারিল্ডা গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এক যাত্রার নাম ড. সুমনপ্রিয় মহাস্থবির। শৈশব থেকেই যাঁর অন্তরে প্রোথিত ছিল ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং জ্ঞানতৃষ্ণা, আজ তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বৌদ্ধ ধর্মের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কক্সবাজারের ফারিকুল বিকেকারাম বৌদ্ধ বিহারে এক রাজকীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে তিনি লাভ করেছেন সম্মানজনক 'মহাস্থবির' পদবী।
শিক্ষা ও গবেষণায় অনন্য কৃতিত্ব:
ড. সুমনপ্রিয় মহাস্থবিরের শিক্ষা জীবন মেধার স্বাক্ষর দিয়ে ঘেরা। ২০০৩ সালে এস.এস.সি এবং ২০০৫ সালে এইচ.এস.সি শেষ করে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যভাষা পালি বিভাগ থেকে ২০১৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, বাংলাদেশ সংস্কৃত পালি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সূত্র, বিনয় এবং অভিধর্মে ৯টি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি অর্জন করেন বিরল 'ত্রিপিটক বিশারদ' উপাধি।
তার জ্ঞানতৃষ্ণা তাকে নিয়ে গেছে বিদেশের মাটিতেও:
থাইল্যান্ডের মহাচুলালংকরণরাজবিদ্যালয়,এখান থেকেই তিনি ২০১৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আচরণ এবং গৃহী সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের পারস্পরিক সম্পর্ক।
ধর্মদূত ডিগ্রি: ২০১৯ সালে থাই ভাষায় গবেষণা সম্পন্ন করে তিনি থাই সরকারের কাছ থেকে 'ধর্মদূত' স্বীকৃতি লাভ করেন।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ:
ড. সুমনপ্রিয় মহাস্থবির কেবল একজন ধর্মগুরু নন, তিনি একাধারে লেখক, গবেষক এবং সংগঠক। শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের মতো অসংখ্য দেশে তিনি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
তার সাংগঠনিক দক্ষতার কিছু দিক:
বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা: তথ্য ও প্রযুক্তি সচিব হিসেবে তিনি এই প্রাচীন সংগঠনের আধুনিকায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। ২০২৪ সালে তার নেতৃত্বেই চালু হয় সংগঠনের নিজস্ব ওয়েবসাইট।
সমাজসেবায় স্বীকৃতি: আর্তমানবতার সেবায় তার অসামান্য অবদানের জন্য ২০২৫ সালে তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ "মাদার তেরেসা গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড"।
এক ঐতিহাসিক রাজকীয় অভিষেক 'মহাস্থবির' বরণকে কেন্দ্র করে ২০২৬ সালের ১৭ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের ফারিকুল বিকেকারাম বৌদ্ধ বিহার যেন রূপ নিয়েছিল এক স্বর্গপুরীতে। ১১ দিন ব্যাপী পবিত্র ভিক্ষু পরিবাস (ওয়াইক) উপলক্ষে আয়োজিত হয়েছিল স্বর্গপুরী মেলা, অভিধর্ম পিটকে পাট্ঠান পাঠ এবং জাতীয় বৌদ্ধ মহাসম্মেলন।
অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে শতাধিক ভিক্ষু সংঘের উপস্থিতিতে ড. সুমনপ্রিয় মহাস্থবিরকে রাজকীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হয়। বাদ্য-বাজনা আর পুষ্পবৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাকে গ্রাম প্রদক্ষিণ করানো হয়, যা ছিল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এই আয়োজনে নেপথ্যে ছিলেন ভদন্ত শীলমিত্র থেরো এবং স্থানীয় জাগ্রত পরিষদ ও গ্রামবাসীবৃন্দ।
"ধর্ম ও সেবার সংমিশ্রণে ড. সুমনপ্রিয় মহাস্থবির বর্তমানে বৌদ্ধ শাসনের উন্নয়নের এক অক্লান্ত সৈনিক।
নিজের শিক্ষা ও অর্জিত জ্ঞানকে শুধু নিজের ভেতর সীমাবদ্ধ না রেখে, তিনি তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। তার বহু প্রবন্ধ ও গবেষণা গ্রন্থ আজ গবেষকদের পাথেয়। লোহাগাড়ার এক নিভৃত পল্লী থেকে উঠে আসা এই মহাপ্রাণ ব্যক্তিত্ব আজ বিশ্বশান্তি ও মৈত্রী প্রচারের এক অগ্রদূত।
মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো * চিহ্নিত।